মোসাদের ‘এজেন্ট’ আহমেদিনেজাদ! ইরান সরকার উল্টে দেওয়ার ইসরায়েলি মহাপরিকল্পনা ফাঁস
ইরানের কট্টরপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক অবিশ্বাস্য ও ভয়ংকর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’। ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন আঁতাত ও দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বর্তমানে তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
বছরের পর বছর ধরে আহমেদিনেজাদকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ‘সম্পদ’ হিসেবে ব্যবহার এবং পরবর্তী সময়ে তাকে ইরানপন্থী নেতা সাজিয়ে তেহরানের ক্ষমতায় বসানোর দূরবর্তী ছক কষেছিল ইসরায়েল।
হাঙ্গেরি সম্মেলন: গোপন বৈঠকের আড়ালে ‘ফ্রন্ট’
২০২৪ সালে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের লুদোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসে একটি জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করা হয়। হাঙ্গেরি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি এই সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে মূল অতিথি ছিলেন আহমেদিনেজাদ। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, এই সম্মেলনটি ছিল মূলত একটি ছদ্ম আবরণ (ফ্রন্ট)। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হাঙ্গেরির মাটিতে কট্টর শত্রু ইসরায়েলের মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে আহমেদিনেজাদের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।
ভোলবদল ও ক্ষমতার লোভ
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালীন আহমেদিনেজাদ ছিলেন ইসরায়েলের কট্টর বিরোধী। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর হঠাৎ করেই তার আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তিনি স্যুট পরা শুরু করেন, বোটক্স নেন এবং ইংরেজি শেখেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মতে, ৩ বার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর তিনি বর্তমান শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় ফিরতে বিদেশি শক্তির সাহায্য নিতে প্রস্তুত হন। নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো একজন সংস্কারক ভেবে তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতায় এলে তিনি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবেন।
আইআরজিসির চোখ ফাঁকি ও গুয়াতেমালা সফর
২০১৭ সাল থেকেই আহমেদিনেজাদের ওপর সন্দেহ ছিল আইআরজিসির। তবে ২০২৩ সালে গুয়াতেমালা সফরের সময় তিনি প্রথম ইসরায়েলি এজেন্টদের সংস্পর্শে আসেন বলে ধারণা করা হয়। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বুদাপেস্ট সফরের সময় সঙ্গে থাকা আইআরজিসির দেহরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ হয়ে যান তিনি।
যুদ্ধের মাঝে ‘কালো পিউজো’র দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে আহমেদিনেজাদকে কেন্দ্র করে মোসাদের মূল পরিকল্পনাটি সক্রিয় হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি আহমেদিনেজাদের তেহরানের বাসভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল বিশৃঙ্খলা তৈরি করে তাকে উদ্ধার করা। হামলার পরপরই একটি কালো পিউজো গাড়িতে করে মোসাদ এজেন্টরা তাকে উদ্ধার করে ইরানের অভ্যন্তরেই একটি সেফ হাউসে নিয়ে যায়। তবে এই হুলস্থুল উদ্ধার অভিযানে বিরক্ত হয়ে আহমেদিনেজাদ ইসরায়েলের সহায়তায় ক্ষমতায় ফেরার মোহ ত্যাগ করেন এবং সেফ হাউস থেকে পালিয়ে যান।
বর্তমান পরিস্থিতি
সেফ হাউস থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তবে সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় কড়া নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে তাকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মাস্ক পরা অবস্থায় দেখা যায়। বর্তমানে আইআরজিসি তাকে কঠোর নজরদারিতে গৃহবন্দি করে রেখেছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তার যোগাযোগের সূত্রগুলো নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চালাচ্ছে।









